বখতিয়ার খিলজি: বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনাপর্বের আলোচিত সেনাপতি
বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাসে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি একটি বহুল আলোচিত নাম। সামরিক দক্ষতা, দ্রুতগতির অভিযান এবং আকস্মিক আক্রমণের মাধ্যমে বিহার ও বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। ১২০৩ সালের দিকে নদিয়া বিজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলার খিলজি শাসনের ভিত্তিও গড়ে ওঠে তার হাত ধরে।
বখতিয়ার খিলজি ছিলেন ঘুরি সাম্রাজ্যের একজন সামরিক অধিনায়ক। ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্রে তাকে তুর্কি বংশোদ্ভূত খিলজি গোত্রের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানগুলো পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তবে তার অভিযান, বিশেষ করে নালন্দা ও অন্যান্য বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র ধ্বংসের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
শৈশব ও সংগ্রামের দিন
বখতিয়ার খিলজির জন্ম আনুমানিক ১১৫০ সালে। তার জন্মস্থান হিসেবে আফগানিস্তানের গরমশির অঞ্চলের কথা উল্লেখ করা হয়। তার শৈশব ও পারিবারিক জীবন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না।
খিলজি গোত্রের সদস্যরা মূলত তুর্কি বংশোদ্ভূত হলেও দীর্ঘদিন আফগানিস্তান অঞ্চলে বসবাস করেছিল। তরুণ বয়সে বখতিয়ার ভাগ্যান্বেষণে সামরিক পেশায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। প্রথমে মুহাম্মদ ঘুরির বাহিনীতে চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে দিল্লিতে কুতুবউদ্দিন আইবেকের দরবারেও যান, কিন্তু সেখানেও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ পাননি।
এরপর তিনি বদাউনে যান। সেখানকার শাসক মালিক হিজবউদ্দিন তাকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেন। কিন্তু সীমিত বেতন ও ছোট পদে সন্তুষ্ট না হয়ে বখতিয়ার অযোধ্যার দিকে চলে যান। অযোধ্যার শাসক হুসামউদ্দিন তাকে দুটি পরগনার জায়গির প্রদান করেন।
এই জায়গিরই পরবর্তী সময়ে তার সামরিক শক্তি গড়ে তোলার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। স্থানীয় সম্পদ ও অনুসারীদের কাজে লাগিয়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজের একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে তোলেন।
বিহার অভিযানে উত্থান
দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরি সামরিক শক্তির সম্প্রসারণ শুরু হলে বখতিয়ারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অল্পসংখ্যক অশ্বারোহী নিয়ে তিনি আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালাতে থাকেন।
তার সাহস ও সামরিক দক্ষতার কথা ছড়িয়ে পড়লে অনেক সৈনিক তার দলে যোগ দেন। এভাবেই ধীরে ধীরে তার বাহিনীর শক্তি বাড়তে থাকে।
বিহার অভিযানের সময় তিনি একটি প্রাচীরঘেরা স্থাপনায় আক্রমণ চালান। সেখানে প্রতিরোধ খুব বেশি না থাকায় তিনি সহজেই স্থাপনাটি দখল করেন। পরে জানতে পারেন, সেটি ছিল একটি বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র। ঐতিহাসিক সূত্রে এ স্থাপনাকে ওদন্তপুরী বিহার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বিহারে সাফল্যের পর বখতিয়ার বিপুল সম্পদসহ কুতুবউদ্দিন আইবেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তার সামরিক সাফল্যে আইবেক সন্তুষ্ট হন। এই সাফল্যের পরই বখতিয়ার পূর্বদিকে আরও বড় অভিযানের পরিকল্পনা করেন।
নদিয়া বিজয় ও বাংলায় প্রবেশ
তৎকালীন বাংলার শাসক ছিলেন সেন রাজবংশের রাজা লক্ষ্মণসেন। তার রাজধানী ছিল নদিয়া। বাংলার অন্যতম শক্তিশালী শাসক হিসেবে লক্ষ্মণসেনের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত ছিল।
ইতিহাসের প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, বখতিয়ার খিলজি ঝাড়খণ্ডের দুর্গম অরণ্যপথ ব্যবহার করে আকস্মিকভাবে নদিয়ার দিকে অগ্রসর হন। তার বাহিনী এত দ্রুত এগিয়ে যায় যে মূল বাহিনী থেকে অল্পসংখ্যক সৈন্যই তার সঙ্গে থাকতে পেরেছিল।
হঠাৎ নদিয়ায় বখতিয়ারের উপস্থিতি রাজপ্রাসাদে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। আকস্মিক আক্রমণে রাজপ্রাসাদের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। লক্ষ্মণসেন নদিয়া ত্যাগ করে পূর্ব বাংলার বিক্রমপুরে আশ্রয় নেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।
নদিয়া দখলের পর বখতিয়ার লক্ষ্মণাবতী বা গৌড়ের দিকে অগ্রসর হন। পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলই তার শাসনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
গৌড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন শাসন
লক্ষণাবতী দখলের পর বখতিয়ার তার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলকে প্রশাসনিকভাবে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। বিভিন্ন অঞ্চলে নিজের বিশ্বস্ত সেনাপতিদের দায়িত্ব দেন।
তার সেনাপতিদের মধ্যে আলী মর্দান খিলজি এবং হুসামউদ্দিন ইওজ খিলজির নাম উল্লেখযোগ্য। এ সময় উত্তর ও পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলেও তার কর্তৃত্ব বিস্তৃত হয়।
তবে বাংলার পুরো ভূখণ্ড তার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল তখনও বিভিন্ন স্থানীয় শাসকের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
নালন্দা ধ্বংস নিয়ে ইতিহাসবিদদের মতভেদ
বখতিয়ার খিলজির নামের সঙ্গে নালন্দা ও অন্যান্য বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র ধ্বংসের প্রসঙ্গ প্রায়ই উঠে আসে। নালন্দা ছিল প্রাচীন ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র।
প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনায় বখতিয়ারের অভিযানের সঙ্গে বৌদ্ধ বিহারগুলোর ধ্বংসের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়। এর ফলে বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু ও শিক্ষার্থী বিভিন্ন অঞ্চলে পালিয়ে যান বলে ধারণা করা হয়।
তবে আধুনিক ইতিহাসচর্চায় এ বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে। কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, বখতিয়ারের অভিযান বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হয়েছিল—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। তাদের মতে, ওই সময় অনেক শিক্ষাকেন্দ্রই রাজনৈতিক অস্থিরতা, পৃষ্ঠপোষকতার সংকট ও অন্যান্য কারণে আগের অবস্থান হারিয়েছিল।
তিব্বত অভিযান ও পরাজয়
বাংলায় নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর বখতিয়ার আরও বড় সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করেন। তার লক্ষ্য ছিল তিব্বতের দিকে অগ্রসর হয়ে তুর্কিস্তানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ তৈরি করা।
প্রায় ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে তিনি লখনৌতি থেকে তিব্বতের উদ্দেশে যাত্রা করেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। অভিযানের পথে বেশ কিছু প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন তিনি।
এক পর্যায়ে স্থানীয় বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বখতিয়ারের সৈন্যরা বিজয়ী হলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। সামনে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের উপস্থিতির খবর পেয়ে তিনি ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
ফেরার পথে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তার বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু ধ্বংস হয়ে যায় এবং স্থানীয়দের আক্রমণে তার কয়েকজন সেনাপতিও নিহত হন। বিপুলসংখ্যক সৈন্য হারিয়ে বখতিয়ার অল্পসংখ্যক অনুসারী নিয়ে লখনৌতিতে ফিরে আসতে সক্ষম হন।
এই ব্যর্থ অভিযান তার সামরিক শক্তিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়।
করুণ পরিণতি
তিব্বত অভিযান ব্যর্থ হওয়ার পর বখতিয়ারের রাজনৈতিক অবস্থানও দুর্বল হয়ে পড়ে। তার বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং নেতৃত্বের দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে অনুসারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
দেবকোটে ফিরে আসার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১২০৬ সালে তার মৃত্যু হয়।
তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে ভিন্নতা রয়েছে। মিনহাজ-ই-সিরাজের বর্ণনা অনুযায়ী, বখতিয়ার খিলজি তারই এক সেনাপতি আলী মর্দান খিলজির হাতে ছুরিকাঘাতে নিহত হন। অন্যদিকে তার অসুস্থতা ও তিব্বত অভিযানের পর শারীরিক-মানসিক দুর্বলতার কথাও বিভিন্ন বর্ণনায় উঠে এসেছে।
ইতিহাসে বখতিয়ার খিলজির উত্তরাধিকার
বখতিয়ার খিলজির শাসনকাল দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তার অভিযান বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেয়। তার মৃত্যুর পর মুহাম্মদ শিরান খিলজি তার উত্তরসূরি হন।
পরবর্তী সময়ে বাংলায় খিলজি শাসনের বিকাশ ঘটে এবং দিল্লিকেন্দ্রিক মুসলিম রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।
বখতিয়ার খিলজিকে তাই শুধু একজন বিজেতা হিসেবে দেখলে বাংলার মধ্যযুগীয় ইতিহাসের পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। তার সামরিক অভিযান যেমন বাংলার রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আনে, তেমনি তার সময়ের ঘটনাগুলো ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনজীবনের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তার কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নে তাই সমকালীন ও পরবর্তী বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রের পাশাপাশি আধুনিক গবেষণার মতামতও বিবেচনা করা জরুরি।